শৈবদর্শনের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছিল ভারতের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন কালে ও বিভিন্ন
বহুযুগবিস্তৃত ভারতীয় দার্শনিক তত্ত্ববিচারের মূল উৎস হলো শ্রুতি এবং তন্ত্রাগমসমূহ। শ্রুতি অর্থাৎ বেদ, উপনিষদ ও আরণ্যকগুলি থেকে বেদান্তাদি ষড়্দর্শনের উদ্ভব—যেখানে যুক্তি-তর্কের আবহে তত্ত্ববিচারের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। এর বিপ্রতীপে ধর্মসম্পৃক্ত দর্শনের প্রতিভূরূপে অবস্থান করছে তন্ত্রাগমসমূহ—যার প্রধান উপজীব্য হলো সাধনা ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির সমাবেশ। প্রধানত শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণব, এছাড়া গাণপত্য, সৌর ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত—যার বিস্তার প্রাচীনকাল থেকেই সমান্তরালভাবে হয়েছিল। শৈবদর্শনের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছিল ভারতের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন কালে ও বিভিন্ন সম্প্রদায়রূপে। শৈবদর্শনের সারকথা—দৃশ্যমান এই জগতের স্বরূপ হিসাবে প্রকাশিত শিব। শিব বা চৈতন্য থেকেই জগতের উৎপত্তি, শিবেই এর স্থিতি এবং শিবেই এর লয়। পরমতত্ত্ব বা পরমেশ্বর স্বেচ্ছায় নিজেকে জগৎ-রূপে অভিব্যক্ত করেন। এখানে জগৎ মিথ্যা নয়, সত্য। দার্শনিক দৃষ্টিতে শৈবদর্শন থেকে উদ্ভূত সম্প্রদায়গুলি প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত—দ্বৈত, দ্বৈতাদ্বৈত এবং অদ্বৈত শৈবসম্প্রদায়—বিশিষ্ট শৈবসাধক অভিনবগুপ্ত তাঁর তন্ত্রালোক গ্রন্থে সমগ্র শৈবসম্প্রদায়কে এই তিনটি ভাগেই বিভক্ত করেছেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে ও প্রেক্ষিতে আটটি শৈবসম্প্রদায়কে বিকশিত হতে দেখা গিয়েছে—পাশুপত, লকুলীশ পাশুপত, শৈব সিদ্ধান্ত, বীর শৈব, নন্দিকেশ্বর শৈব, রসেশ্বর শৈব, ত্রিক শৈব ও বিশিষ্টাদ্বৈত শৈব। দ্বৈত শৈব-ভাবনায় সমৃদ্ধ পাশুপত সম্প্রদায়ই প্রাচীনতম। দুর্ভাগ্যবশত এই মতাবলম্বী সাধকদের রচিত কোনো গ্রন্থ আর পাওয়া যায় না; কিন্তু ‘বেদান্তসূত্র’-এর শাঙ্করভাষ্যের ওপর ‘রত্নপ্রভা’, ‘ন্যায়নির্ণয়’ প্রভৃতি টীকায় এর উল্লেখ আছে। অদ্বৈতবেদান্তের প্রবক্তা আচার্য শঙ্কর তাঁর ‘শারীরক ভাষ্য’-এ পাশুপত মতের আলোচনা করেছেন। তিনি এখানে মোট তিনটি শৈবমতের উল্লেখ করেছেন—কালামুখ, কারুণিক শৈব এবং সিদ্ধান্ত শৈব। সম্ভবত পাশুপত মত এই তিনটির কোনো একটি মতের সঙ্গে অভিন্ন। মহাকৌল সাধক মৎস্যেন্দ্রনাথ পাশুপত শৈবধারার সন্ন্যাসিরূপেই নেপালে গমন করেন এবং সেখানে শৈবমতের প্রচার করেন।১ অপর যে-শৈবমতটি দ্বৈতভাবনায় পুষ্ট, তা হলো—শৈব সিদ্ধান্ত, যা দক্ষিণভারতে বিশেষত তামিলনাড়ুর বিস্তৃত অঞ্চলে প্রাচীন যুগ থেকে আজও সমানভাবে প্রচারিত। তেষট্টিজন তামিল শৈবসাধক, যাঁদের ‘নাইনার’ নামে অভিহিত করা হয়, তাঁরা এই শৈব সিদ্ধান্ত মতবাদকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। জাতি-বর্ণ-লিঙ্গ, উচ্চ-নিচ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে কেবল পরমশিবকে ভালবেসে এঁরা সকলেই মুক্তিলাভ করেছিলেন।২...
Read the Digital Edition of Udbodhan online!
Subscribe Now to continue reading
₹120/year
Start Digital SubscriptionAlready Subscribed? Sign in
