মিতালী বিশ্বাস

সপ্তদশ শতকের শেষলগ্নে মল্ল রাজসভার কবি দ্বিজ কবিচন্দ্র শঙ্কর চক্রবর্তী মঙ্গলকাব্য ধারার অনুবর্তী হয়ে রচনা করেন এক ভিন্ন বিষয় ও আঙ্গিকের মঙ্গলকাব্য কপিলামঙ্গল। বেদ ও পুরাণে উল্লিখিত স্বর্গগাভি কপিলা ও তার পুত্র মনোরথকে কেন্দ্র করে একেবারে ছকভাঙা এক নতুন মঙ্গলগান উপস্থাপিত করেন। তাঁর কাব্যের মুখ্য চরিত্র কপিলা মঙ্গলকাব্যের অন্য দেবতাদের মতো নিজের পূজা প্রচারের জন্য মর্তে আসেননি। কবি কপিলা ও মনোরথের মাধ্যমে মানবজাতির হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ, পাপ-পুণ্য, মানবিকতা ও কর্তব্যবোধকে তিনি ফিরিয়ে দিতে চেয়েছেন।

কপিলামঙ্গল কাব্যের প্রাচীন আলেখ্য আমরা খুঁজে পাই বাংলার বিভিন্ন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আদিবাসী জনসমাজের মধ্যে। তিনি কাব্যে যে গো-ভক্তি, গো-অর্চনা ও গো-বন্দনার কথা উল্লেখ করেছেন, তারই একটি প্রয়োগগত বাহ্য রূপ আদিবাসী জনজাতিগুলি যুগ যুগ ধরে পালন করে আসছে।

গোমাতা কপিলা হিন্দু সমাজের আরাধ্যা দেবী হলেও বাঁদনা পরবের প্রবল ধুমধাম কুর্মি, সাঁওতাল প্রভৃতি ভারতবর্ষের আদিম জনজাতির উপচারের মধ্যে রয়েছে। ক্ষেত্রসমীক্ষার অভিজ্ঞতায় আমরা সেই অনুসন্ধানের চেষ্টা করব।

দ্বিজ কবিচন্দ্র শঙ্কর চক্রবর্তীর কপিলামঙ্গল কাব্যের লৌকিক উৎস আমরা খুঁজে পাই পশ্চিম রাঢ় ও মানভূম অঞ্চলে। মানভূম, ধলভূম, ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম রাঢ়ের পশ্চিম প্রান্তের সমগ্র অঞ্চল জুড়ে অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিম মেদিনীপুর, ময়ূরভঞ্জ, পশ্চিম বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, আসানসোল, সীমান্ত বীরভূমে এই উৎসব উদ্‌যাপিত হয়। এই উৎসবেরই প্রচলিত নাম বাঁদনা পরব।

“বড় গঙ্গায় আছে ভালা গরু তোর বাপ গো—/ ছোট গঙ্গায় আছে গরু ভাইরে—/ পাহাড় পর্বতে আছে বাঁধনারই পরব—/ পরব কবে আনা গোনা বে।”১ ধামসা, মাদল ও নাকারা সহযোগে এই গানের মধ্য দিয়েই শুরু হয়ে যায় বাঁদনা পরব। এই সমস্ত অঞ্চলে কঠিন মাটির বুক চিরে ফসল ফলাতে একমাত্র সহযোগী হচ্ছে শক্তিশালী গোরু—যার নাম ‘বরদা’ (বলদ বা বলদা) এবং বজ্রদেহী ‘কাঁড়া’ বা পুরুষ মোষ। তাই ঘরে ফসল থাকুক বা না থাকুক, বাঁদনা পরবের মূল উপজীব্য হলো গোপাল-গোবিন্দের সেবিত গো-কুল।

গোরু মাত্রই ভগবতী। ভগবতী অর্চনার প্রধান তিথি হচ্ছে কার্তিক অমাবস্যায় দীপালি উৎসবের তিথি। ভারতবর্ষে গো-বন্দনার রেওয়াজ অত্যন্ত প্রাচীন। সমগ্র পূর্বভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বছরের বিভিন্ন সময় গো-দেবতাকে কেন্দ্র করে নানা উৎসব পালিত হয়। হিন্দু শাস্ত্র-মতে ‘গোপাষ্টমী তিথি’ গো-বন্দনার জন্য নির্ধারিত হলেও বাঁদনা পরবের একমাত্র তিথি কার্তিক অমাবস্যা। গবেষকরা ‘বাঁধনা’ বা ‘বাঁদনা’ শব্দটিকে দুরকমভাবে বিশ্লেষিত করেছেন। তাঁদের মতে, এর মূলে বন্ধন এবং বন্দনা দুটি বিষয়ই থাকা স্বাভাবিক।২ গোরু বা মোষকে খোঁটায় বেঁধে নাচানো হয় বলে এই উৎসবের নাম ‘গোরু-বাঁধনা’। অন্যভাবে গোরু বা মোষের বন্দনা বা পূজার জন্যই বাঁদনা পরব। গবেষক সাধন মাহাতর মতে—“উৎসবটিকে কুড়মালি ভাষাভাষী মানুষজন বলেন সঁহরই, সাঁওতালি মানুষজন বলেন সহরাই। কুড়মালি ভাষায় এই শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—এই নামে একপ্রকার ঘাস পাওয়া যায় যেটা বাঁদনা পরবের আচার-অনুষ্ঠানে প্রয়োজন হয়়। সাঁওতালি সহরায় শব্দটির অর্থ খুঁজলে দেখা যায় সাঁওতালিতে সারহাও-এর অর্থ প্রশংসা।”৩
সাঁওতাল পরগনা ও বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে এই উৎসব কার্তিক মাসের পরিবর্তে পৌষ মাসে অনুষ্ঠিত হয়। কার্তিক মাসে স্বাভাবিক অন্নাভাবের কারণে পৌষ মাসের শেষে নতুন ফসল ঘরে এনে এই আরাধনা শুরু হয়।

চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী কার্তিক অমাবস্যার আগের দিন থেকে মোট পাঁচ দিনব্যাপী বাঁদনার উৎসবে মুখরিত হয়ে ওঠে এই সমস্ত এলাকা। অবশ্য, পরবের শুভ সূচনা হয় এর কয়েকদিন আগে। আদিবাসী সম্প্রদায়ের গাঁয়ের প্রধান মাহাত বা চূড়ামণি, লায়া (কুর্মিদের পুরোহিত), দেহরি কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি নির্ধারণ করেন ৩, ৫, ৭ বা ৯—কদিন ধরে গবাদি পশুর শিঙে গৃহস্বামী তেল মাখাবে। এরা বলদের মাধ্যমে ঘানি থেকে তেল বের করে সেই তেল গোরুর শিঙে মাখানোর পক্ষপাতী নয়। তারা গোরুর শিঙে কচড়া তেল (মহুয়া ফলকে বলে কচড়া) মাখানোয় বিশ্বাসী। কারণ, কচড়া তেল প্রস্তুত করতে গো-ধনকে খাটাতে হয় না। তবে এই তেলের অপ্রতুলতার কারণে বর্তমানে সরষের তেল ব্যবহৃত হচ্ছে। বাড়ি-ঘর, গোয়াল, উঠান সর্বত্র মাটি-গোবর নিকিয়ে ঝকঝকে-তকতকে করা হয়। এর সঙ্গে এই মানুষেরা নিজেদের পোশাক-পরিচ্ছদ ও দেহ পরিমার্জন করে উৎসবের জন্য প্রস্তুত হয়। এইভাবে বিভিন্ন লোকাচারের মাধ্যমে পাঁচদিনের যে বাঁদনা পরব হয়, তার একটি ধারাবাহিক বর্ণনা দেওয়ার জন্য আমাদের দেখা বাঁকুড়া জেলার রানিবাঁধ ব্লকের লদ্দা গ্রামের বাঁদনা পরবের কথা উল্লেখ করলাম।

প্রথম দিন : গোরু চুমানো—অমাবস্যার আগে, ত্রয়োদশী বা চতুর্দশীর দিন বাড়ির সব গাই, গোরু, মোষ, কাঁড়াকে নদী বা পুকুরে স্নান করানো হয়। পরে বাড়িতে এনে শিঙে ভাল করে তেল মাখানো হয়। একে বলে ‘গোরু চুমানো’। পরবের পাঁচদিনই এটি হয়। সেইসঙ্গে খুব সতর্কতার সঙ্গে এই পাঁচদিন গবাদি পশুদের কচি ঘাস খাওয়ানো হয়, অন্য কোনো খাবার দেওয়া হয় না।

দ্বিতীয় দিন : কাঁচি দুয়ারি—অমাবস্যার দিন গোধূলিবেলায় শালপাতায় চালগুঁড়োর (এই উৎসবের জন্য চাল গঁুড়ো করা হয় ঢেঁকিতে) পিণ্ড বানিয়ে তাতে পরিমাণমতো গাওয়া ঘি ঢেলে, কাপাস তুলোর সলতে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। দুয়ার, আঙিনা, খামার সর্বত্র টিমটিম করে জ্বলে ঘৃতপুষ্ট অগ্নিশিখা। এরই পোশাকি নাম ‘কাঁচি দুয়ারি’ বা ‘কাঁচি জিওরি’। ঘরে দুয়ারে এহেন মঙ্গলদীপ জ্বেলে গাওয়া হয় সহরই গীত—“ভালা অহিরে এ এ এ…/ কণ দিয়া বরয়ে সাঁঝেকো বেরিয়ারে,/ বাবু হো ও ও ও…/ কণ দিয়া বরত বিহান,/ কণ দিয়া বরয়ে আম মাড়ইয়াঁই,/ সেই দিয়া বরত বিহান।”৪

গঠপূজা—অমাবস্যার দিন গাঁয়ের লায়া বা দেহরি দিনভর নির্জলা উপোস করে গ্রামের শেষপ্রান্তে রাঙামাটির পথে ৯টি ঘর কেটে কপিলার সন্তানদের মঙ্গলকামনায় গঠপূজা করে। গঠ মানে গোরুর পাল। পূজাস্থলে রেখে দেওয়া হয় দেশি মুরগির ডিম অথবা তার প্রতীক হিসাবে চালগুঁড়োর মণ্ড। যার বলদের পদাঘাতে সেই ডিম ভাঙে, সেই বলদের অধিকারী বা ‘খামিদ’কে মনে করা হয় ভাগ্যবান। ভাগ্যবান খামিদ সব গোপালকের পা ধুইয়ে আদর-যত্ন করে ‘গঠ ডেংঘা’ নামে লোকাচারটি সুসম্পন্ন করে। গঠপূজার একটি অহিরা গীত হলো—“অহিরে—আঝু যে হেকেইক ভালা/ গঠঅ পুজাক দিন/ গউ-গেইআ ধনি ঘুরতউ বাথান/ গেইআ জে ধনি ত ঘুরতউ বাথান/ গউ আঝু হেকেইক/ গঠঅ পুজাক দিন।”৫

জাগরণ বা গাইজাগা—এরপর ‘অমানিশা’ নামলেই নিকষ অন্ধকারে ভারতের নানা প্রান্তে যখন দীপান্বিতার আলোকসজ্জা আর কালীপূজা, তখন এতৎ অঞ্চলের প্রতিটি গোয়ালঘরে জ্বলে শুভংকরী মাটির প্রদীপ। কাঁড়ার তেল-চকচকে গোরুর শিংগুলি প্রদীপের আলোয় হয়ে ওঠে মায়াবী। ঢোল, ধামসা, মাদলের বজ্রনির্ঘোষে বন্দনাকারীরা গো-সন্তানদের অভিনন্দন জানায়। এদের প্রচলিত নাম ‘ঝাঁগড়’ বা ‘ধেঙ্গুয়ান’। সারারাত ধরে ঢোল, মাদইর, বাঁশি ইত্যাদি নিয়ে পূজা-আরাধনার অহিরা গীত গেয়ে রাত্রিজাগরণ করে ও গো-মাতার কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে বলে : “অহিরে—আজ কা রাতি ভালা অমাবস্যার রাইতরে/ আর জাগে মা লক্ষ্মী, জাগে ভগবতী অহিরে…/ পাঁচ পুতা দশ ধেনু গায় রে।”৬ অর্থাৎ, আজ জাগরণের রাত। ল‌ক্ষ্মী বা ভগবতী বলতে এখানে বৈদিক লক্ষ্মী নন, তাদের ল‌ক্ষ্মী বা ভগবতী হলেন ‘গরইয়া’=গ+রইয়া। ‘গ’ অর্থে গোরু ও ‘রইয়া’ অর্থে দেবী। অর্থাৎ গোরু দেবী বা ভিন্নার্থে স্ত্রী গোরু। আর ‘গসঞারাই’=গ+সঞা+রাই। ‘গ’ অর্থে গোরু, ‘সঞা’ অর্থে স্বামী ও ‘রাই’ অর্থে দেব। অর্থাৎ, গোরুর স্বামী—বলদ গোরু দেবতা। এদের কোনো মূর্তিপূজা নেই। এদের কাছে প্রার্থনা করে বলা হয়—আমায় যেন পাঁচটা ছেলে ও দশটি ধেনু, গাই আশীর্বাদস্বরূপ দেন। জাগান শেষ হলে গৃহস্বামী মহানন্দে ঝাঁগড় দলের হাতে তুলে দেয় দু-পাঁচ টাকা, দু-এক সের চাল। গিন্নি ঝুলি ভরে পিঠালাঠা (খাপরা পিঠা, ছিলকা পিঠা, গুড় পিঠা, মশলা পিঠা), মুড়িচিঁড়া দিয়ে ‘ঝাঁগড় বিদায়’ করে। এইদিন গোয়ালঘরে একটি প্রদীপ সারারাত জ্বলে। একে বলে ‘জাগর বাতি’।

তৃতীয় দিন : গরইয়া—বাঁদনার তৃতীয় দিনে অর্থাৎ শুক্লপক্ষের প্রথম দিনের চাঁদে হয় গরইয়া পূজা। বাড়ির মায়েরা উপোস করে পানিয়া লতা মাড়াই করে তার নিষ্কাশিত সান্দ্র রসে আতপচালের গুঁড়ি মিশিয়ে নতুন মাটির তকতকে উঠানে আঁকে চইখ বা চউক বা আলপনা। চইখপুরা পুরো উঠানে এঁকে ভূতপিঁড়ির (হিন্দু সংস্কৃতির তুলসীমঞ্চের আদলে গঠিত মাটির মঞ্চ। কিন্তু এখানে তুলসীগাছের পরিবর্তে অন্য ফুলের গাছ থাকে) কাছে সাজিয়ে রাখা হয় হাল, মই, জোয়াল ও চাষের বিভিন্ন সরঞ্জাম। বাড়ির কর্তা নদী বা পুকুর থেকে তুলে আনে ‘গরইয়া ফুল’ অর্থাৎ ডাঁটা-সহ শালুক ফুল। শক্ত কাঁকর-মেশানো মাটি দিয়ে গোবর্ধন পর্বত তৈরি করা হয়। কারণ, এই পর্বত গোয়ালঘরে না আনলে পূজা করা যায় না। গৃহকর্ত্রী চালগুঁড়ো দুধে গুলে নবনির্মিত মাটির উনানে ঘিয়ে ছেঁকে তৈরি করে পিঠা। দুধ, গুড়, আতপচাল, পিঠে, সিঁদুর, ধূপ ইত্যাদি উপচারে গোয়ালঘরে পূজিত হন গরাম, ধরম, বসুমাতা, গসঞারাই, নাজি লিলঅউরি, গাই গরইয়া, মৈস গরিয়া, ডিনি ঠাকুরাইন ও বড়োপাহাড়। গরাম ঠাকুরের উদ্দেশে লাল মোরগ ও ধরম ঠাকুরের উদ্দেশে সাদা মোরগ উৎসর্গের মাধ্যমে সমাপন ঘটে গরইয়ার।

এদিন সন্ধ্যাবেলায় বাড়ির কর্তা-কর্ত্রী গাই ও বলদের বিবাহের অনুকরণে আচার পালন করে। এই জোড়ার কপালে সিঁদুরের ফেঁাটা, গায়ে সিঁদুরের ছাপ, পানিয়া লতা ও চাল-গুঁড়ির আলপনার ছাপ দেওয়া হয়। মাথায় নতুন ধানের মৌড় বা মুকুট পরিয়ে, চিরুনি দিয়ে গায়ের লোম আঁচড়ে, আয়নায় মুখ দেখিয়ে দূর্বা, ধূপ-ধুনো দিয়ে চুমানো হয়।

চতুর্থ দিন : গোরুখুঁটা বা খুঁটান—কৃষিজীবী মানুষদের কাছে বলদ পুত্রস্বরূপ। গৃহস্থের শ্রীবৃদ্ধির জন্য বছরভর তারা অক্লান্তভাবে খাটে। তাই বাঁদনার এই দিন ধানের তৈরি হারে বিভূষিত করা হয় কপিলাসন্তানদের। জোয়ালক্ষত কাঁধে পরম মমতায় লাগিয়ে দেওয়া হয় তেল ও মেথি বাটা। কাঁচাপাকা ধানের শিষ ছিঁড়ে তৈরি করা হয় অনিন্দ্যসুন্দর মুকুট ও সিঁথলি, পরানো হয় গোরুর মাথায় আর কপালে। স্নেহার্দ্র চিত্তে হলুদ-গোলা জলে গবাদি পশুদের পদপঙ্কজ ধুইয়ে দেয় গৃহিণীরা। লাল-নীল রঙে সাজিয়ে দেওয়া হয় গোরুর দেহ। বাড়ির মহিলারা নতুন শাড়ি পরে, ছেলেরা সকাল থেকে উপোসি থেকে নতুন কুলোয় নৈবেদ্য সাজিয়ে ভক্তিভরে চুমান বাঁদনা করে। এই পর্যায়ের লোকাচারে অশুভ শক্তির হাত থেকে গোধনকে বাঁচাতে বাড়ির রমণীরা একটি মাটির পাত্রে আগুন-সহ ধুনা নিয়ে গিয়ে শেষে প্রথা অনুযায়ী পায়ের আঘাতে ভেঙে ফেলে। মৃৎপাত্র ভেঙে ফেলার রীতিটির পরিভাষাগত নাম ‘নিমছান’।

এদিনই শেষ বিকেলে গাঁয়ের প্রান্তে সুপরিসর মাঠে সবাই ভিড় জমায়। শক্ত খুঁটিতে বাঁধা হয় সুপুষ্ট, বলবান, তেজি বলদ আর দুর্দম, উদ্দাম কাঁড়া। ঝাঁগড়ের তারস্বরে অহিরা আর অভ্রভেদী বাজনা শুনে রোষে ফুলে ওঠে বরদা, কাঁড়া। সাহসী পুরুষরা বাঁধা কাঁড়ার সামনে মৃত পশুর চামড়া ধরে। সমবেত কুলকুলি শুনে উন্মত্তের মতো ফুঁসে ওঠে খুঁটানো বা খুঁটিতে বাঁধা কাঁড়া। খুঁটিকে ঘিরে চরকির মতো পাক খায়, কখনো প্রবল বিক্রমে গুঁতো মারে চর্মখণ্ডে। নিজের আপাতশান্ত বলদটিকে উত্তেজিত করতে কেউ কেউ কানে আঙুল চেপে অহিরা হাঁকায়—“ভালা অহিরে—,/ সব দিন যে চরাই ভালা, বনে জঙ্গলে রে,/ বাবু হো—, আজি তর দেখিব মর্দানী,/ আজকার রণে ভালা, জিতি যদি যাবে রে,/ বাবু হো—, চারিপায়ে নূপুর ছাহাবো।”৭
আপাতদৃষ্টিতে এই বলদখুঁটার মধ্যে কৃষিকর্মে ক্লান্ত, প্রান্তভূমির ব্রাত্যজনদের চিত্তবিনোদনের দিকটি পরিলক্ষিত হলেও অনেকের মতে এটি এই অঞ্চলের আদিম অধিবাসীদের জীবনসংগ্রামের ইতিহাসের চলমান দলিল। অরণ্যবেষ্টিত এই ভূখণ্ডটি ছিল শ্বাপদসংকুল। প্রায়ই অযোধ্যা, দলমা থেকে আগত হানাদার জন্তুর কবলে পড়তে হতো এদের। কাজেই অস্তিত্বের জন্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে আত্মরক্ষার কৌশল রপ্ত করে নিজেরা। অনুরূপ কসরত শিক্ষা দেওয়া হয় গৃহপালিত পশুদেরও। একবিংশ শতাব্দীর গোরুখুঁটা সেই কসরত শিক্ষারই একটি পরিবর্তিত রূপ।

পঞ্চম দিন : বুড়ি বা বুঢ়ী বাঁদনা—বৃষ যদি হয় বল ও বীর্যের প্রতীক, তবে গাভি হলো কল্যাণী, শুভশক্তির প্রতীক। উৎসবের পঞ্চম অর্থাৎ শেষদিন বুড়ি বাঁদনা গৃহপালিত বলদের পৌরুষত্ব দেখানোর তিথি। কোনো কোনো অঞ্চলে বুড়ি বাঁদনার দিনে সেই ‘মর্দানী ক্ষেত্র’-এ বন্ধ্যা গাভিকে বেঁধে ঘোরানোর রেওয়াজ প্রচলিত। এর ফলে গাভি প্রজননে সক্ষম হবে—এই লোকবিশ্বাসের নাম ‘গাইখুঁটা’! এটি বছরভর দুধ দেওয়া ধেনুদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনেরও দিন। গাভিদের অভিমান ভাঙানো, কৃতজ্ঞতা-জারিত অহিরা ধ্বনিত হয় গ্রামের পথে-প্রান্তরে।

গ্রাম্য কবিদের রচিত, লোকমুখে প্রচলিত অহিরা-গুলির মূল ভাষা কুড়মালি। পুরুলিয়ার উত্তরাংশে, পশ্চিম মেদিনীপুর, ছোটনাগপুরের হাজারিবাগ, রাঁচির পাঁচ পরগনা অঞ্চলে প্রচলিত অহিরাতে কখনো ফুটে ওঠে সরল কথায় মানবজীবনের জটিল জীবনদর্শন। আবার কখনো উৎসারিত হয় নিজেদের সংস্কৃতি-সঞ্জাত আবেগ। কপিলামঙ্গল কাব্যে কবিচন্দ্র স্বর্গবাসী সমস্ত দেবতা-সহ গোবিন্দ নারায়ণের যে গো-সেবার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন, তারই বাস্তব রূপ আমরা বাঁধনা পরবের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের পরতে পরতে দেখতে পাই। সভ্য সমাজ থেকে অনেক দূরে থাকা প্রান্তবর্গের এই মানুষগুলি যেন গোটা পৃথিবীকে শিক্ষা দেয় কৃষিকাজ ও পশুপালন যে-সভ্যতার সৃষ্টি ও বিকাশের মূলে—সেই সভ্যতার মানুষগুলো প্রকৃতি ও গবাদি পশুর প্রতি কৃতজ্ঞ ও ঋণী।

তথ্যসূত্র

১ করণ, সুধীর কুমার, সীমান্তবাঙ্‌লার লোকযান, এ মুখার্জী এন্ড কো প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, ১৩৭১, পৃঃ ১৬৬
২ ঐ, পৃঃ ১৬৭
৩ মাহাত, সাধন, ‘বাঁদনা : আদিবাসী জীবনদর্শন’, ‘অহিরা পত্রিকা’, ১১শ সংকলন, ফেব্রুয়ারি ২০২২, পৃঃ ২৩-২৪
৪ ব্যক্তিগত ক্ষেত্রসমীক্ষা, সাক্ষাৎকারদাতা—লেলি মাহাত ও পুষ্প মাহাত; তাঁরা লদ্দা গ্রামের অহিরা দলের প্রধান দুই গায়িকা। বয়স ৫০। ঠিকানা : গ্রাম—লদ্দা, পোঃ রুদড়া, ব্লক/থানা—রানিবাঁধ, জেলা—বাঁকুড়া, তারিখ—২৪/১০/২০২২। সাক্ষাৎকার-গ্রহিতা : গবেষক।
৫ ঐ
৬ সরকার, ধীরেন্দ্রনাথ, ‘লোকসংগীত’, জেলা লোকসংস্কৃতি পরিচয়, লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, বাঁকুড়া, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ২০০২, পৃঃ ৮৫
৭ ব্যক্তিগত ক্ষেত্রসমীক্ষা, সাক্ষাৎকারদাতা—গুণধর মাহাত, মনোহর মাহাত, সহদেব মাহাত, বিনোদ মাহাত। এঁরা লদ্দা গ্রামের ঝাঁগড় দলের গায়ক। বয়স ৬৪, ৫৬, ৫৫, ৫০। ঠিকানা : গ্রাম—লদ্দা, পোঃ রুদড়া, ব্লক/থানা—রানিবাঁধ, জেলা—বাঁকুড়া, তারিখ—২৪/১০/২০২২। সাক্ষাৎকার-গ্রহিতা : গবেষক।

কৃতজ্ঞতা :

বিকাশ মাহাত, বিপ্লব মাহাত, খাতড়া গ্রাম
এবং বিভাষ মাহাত, চিরুগড়া গ্রাম, বাঁকুড়া

গবেষক, বাংলা বিভাগ, বিশ্বভারতী