দেহবোধশূন্য ও দেহসুখের কামদহনকারী শিবের কাছে চিতাভস্মই একমাত্র

১৯০১ সালের জানুয়ারি মাস। স্বামী বিবেকানন্দ এসেছেন নগাধিরাজ হিমালয়ের মাঝে অবস্থিত মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রমে। স্বামীজীর শিষ্য ব্রহ্মচারী জ্ঞান মহারাজ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখছেন : “মায়াবতীতে স্বামীজীর ঘরের জানালা দিয়ে চির-তুহিন গিরিমালা দেখা যেত। তিনি নিরালায় বসে বসে উপভোগ করতেন। একদিন আমাকে ঐ সৌন্দর্য দেখালেন, ‘দ্যাখ দ্যাখ! কি চমৎকার! শিবের স্তব জানিস?’—বলেই একটি স্তব অতীব শুদ্ধবাণী সমন্বিত অশ্রুতপূর্ব অপরূপ কণ্ঠে আবৃত্তি করলেন—(‘গাত্রং ভস্মসিতং সিতঞ্চ হসিতং হস্তে কপালং সিতং/ খট্বাঙ্গঞ্চ সিতং সিতশ্চ বৃষভঃ কর্ণে সিতে কুণ্ডলে।/ গঙ্গাফেনসিতা জটা পশুপতেশ্চন্দ্রঃ সিতো মূর্ধনি।/ সোঽয়ং সর্বসিতো দদাতু বিভবং পাপক্ষয়ং সর্বদা।।—পশুপতির গায়ে শুভ্র ভস্ম! হাস্য শুভ্র। হাতে শুভ্র নরকপাল। দণ্ড শুভ্র। বাহন বৃষভ—শুভ্র। কর্ণে দুই শুভ্র কুণ্ডল। মাথায় জটা—গাঙ্গফেনসমূহ দ্বারা শুভ্র। ভালে শুভ্র অর্ধচন্দ্র।—তিনি সর্ব শুভ্র। তিনি আমাদের সর্বদা পাপক্ষয়রূপ বিভব দান করুন।’) ভাবটা এই—মহাদেবের সবই সাদা—আর তিনি জ্যোতির্ময়।”১ এই সর্বাঙ্গ শুভ্রতা, এই আপাদমস্তক উজ্জ্বলতা মহাদেবের নিষ্কলুষ জ্ঞানময়তার নির্দেশক। এই জ্ঞানোজ্জ্বল শিবতত্ত্ব সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের ভাবনার একদিকে রয়েছে চরম বৈরাগ্যসঞ্জাত ধ্যানগাম্ভীর্য, আবার আরেকদিকে রয়েছে নটরাজের দৃপ্ত পদবিক্ষেপে জগৎকল্যাণ। ‘বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধের অন্তর্গত ‘স্বদেশমন্ত্র’-এ স্বামীজী ভারতবাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তাদের চিরকালীন আদর্শ—‘ভুলিও না—তোমার উপাস্য উমানাথ সর্বত্যাগী শঙ্কর।’২ স্বামীজীর শিবভাবনা এক বহুমুখী আদর্শের সন্ধান দেয়। ‘ত্যাগেনৈকে অমৃতত্বমানশুঃ’ সর্বত্যাগী শঙ্কর সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, চাইলে সর্ব-ঐশ্বর্য সর্বসুখ ভোগ করতে পারেন। তা সত্ত্বেও তিনি এই জগৎ অসার অনিত্য জ্ঞান করে শ্মশানকে সার করে বিরাজ করছেন। দেহবোধশূন্য ও দেহসুখের কামদহনকারী শিবের কাছে চিতাভস্মই একমাত্র জীবনসত্য। নিজের জ্ঞাননেত্রে ভোগবাদ ভস্মীভূত করে মহাদেব যেন কৈবল্যোপনিষদ-এর সুরে গলা মিলিয়ে ঘোষণা করছেন : “ন কর্মণা ন প্রজয়া ধনেন ত্যাগেনৈকে অমৃতত্বমানশুঃ।” আদিকাল থেকে ভারতবর্ষ শিবের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আসছে। তার প্রমাণ ভারতের চতুরাশ্রম প্রথা। শুরুতে ব্রহ্মচর্য—আশ্রমের ত্যাগ-তপস্যার ভিত্তিতে গঠিত সুশৃঙ্খল গার্হস্থ এবং শেষে আবার বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাসের সর্বত্যাগের সুরে ঘরে ফেরা। একসময় যিনি রাজা হয়ে ঐশ্বর্যের মধ্যে নিমজ্জিত, তিনিও জীবনের শুরুতে পালন করেছেন কঠিন ব্রহ্মচর্য ব্রত এবং গার্হস্থকর্তব্য নির্বাহের শেষে বনে গমন...

Read the Digital Edition of Udbodhan online!

Subscribe Now to continue reading

₹120/year

Start Digital Subscription

Already Subscribed? Sign in