স্বামী বিবেকানন্দ ধর্মমহাসম্মেলনের অল্প কিছুকাল পরেই তাঁর শিকাগোর আতিথ্যদাত্রী Mrs. Lyon-কে বলেছিলেন : “The greatest temptation of his life in America… is organisation.” সংঘ করবেন কি না—এসম্পর্কে স্বামীজীর মনের মধ্যে দ্বিধা ছিল। তিনি বলছেন : “If I organize, the spirit will diminish. If I do not organize, the message will not spread.” তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, সংঘের প্রতিষ্ঠা করবেন। তাই হলো। প্রতিষ্ঠিত হলো ‘রামকৃষ্ণ মিশন’। সর্বপ্রথমে আমাদের ‘রামকৃষ্ণ সংঘ’ ও ‘একুশ শতক’—এই দুটি শব্দবন্ধের অর্থ অনুধাবন করতে হবে।


রামকৃষ্ণ সংঘ—এই কথাটির মধ্যে দুটি ভাব নিহিত আছে। একটি আদর্শগত ও একটি প্রাতিষ্ঠানিক। রামকৃষ্ণ সংঘের আদর্শগত চেহারাটি সর্বব্যাপী—এর কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। এটি একটি ভাব, একটি দর্শন! কেউ একজন রামকৃষ্ণ মঠ বা রামকৃষ্ণ মিশনের সাথে সংস্রব না রেখেও, পরিচিত না হয়েও রামকৃষ্ণ সংঘের অঙ্গ হতে পারেন। সেটি কেমন? সেটি হচ্ছে, কেউ যদি রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের দর্শন যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে সেই উপাদানগুলিকে আঁকড়ে ধরে তাঁর জীবনশৈলী গঠন করেন অথবা এই ধ্যান-ধারণাগুলোকে জীবনব্রত হিসাবে গ্রহণ করেন—তিনি কিন্তু নিজের অজানতেই রামকৃষ্ণ সংঘের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন। এটি হচ্ছে আদর্শগত দিক। এখন কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, সেই উপাদানগুলো কী কী?সেগুলো হলো

১. আত্মার অমরত্ব (Divinity of soul)
২. ঈশ্বরের একত্ব (Unity of Godhead)
৩. সর্বধর্মসমন্বয় (Harmony of Religions)
৪. শিবজ্ঞানে জীবসেবা (Work is Worship)
৫. ঈশ্বরের প্রতি ব্যাকুলতা (Intense yearning for God-realization)
৬. সত্যকথা কলির তপস্যা—এটি বিশ্বাস করা এবং তদনুযায়ী আচরণ করা (Conviction in the Truth and Goodness of soul)
৭. ধর্মের ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি (Scientific temper in Religion)
৮. বিজ্ঞান ও বেদান্তের মেলবন্ধন (Coupling of Science and Vedanta)
৯. সহিষ্ণুতা শুধু নয়, গ্রহিষ্ণুতাও (Not only tolerance, but acceptance too)
১০. মতুয়ার বুদ্ধি না করা (Not to be dogmatic)।

আবার রামকৃষ্ণ সংঘের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপও আছে। এই দিকটিকে আমরা ‘institutionalised religion’ বলি। এর আকার, আঙ্গিক আছে। ভৌগোলিক সীমানাও আছে। যেমন—রামকৃষ্ণ মঠ (কথামৃত ভবন) অথবা রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার অথবা রামকৃষ্ণ মিশন সেবাপ্রতিষ্ঠান। এখানে রামকৃষ্ণ সংঘ বলতে বোঝায় সন্ন্যাসী, ব্রহ্মচারী ও গৃহিভক্তদের। এই রামকৃষ্ণ সংঘের সাকার রূপটিই হচ্ছে রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন। যারা রামকৃষ্ণ মঠ বা রামকৃষ্ণ মিশনের কর্মধারার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত, তারাই রামকৃষ্ণ সংঘের ভক্ত।
আমরা কিন্তু দুটি দৃষ্টিকোণ (aspect) নিয়েই আলোচনা করব।


প্রশ্ন হচ্ছে, ‘একুশ শতক’কে ‘define’ করার কোনো প্রয়োজন আছে কি?—কারণ এক-একটি শতক এক-একটি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পরিচিত। যেমন ঊনবিংশ শতাব্দী পরিচিত ‘A Century of Industrial Revolution’ হিসাবে। ভারতের ক্ষেত্রে এর পরিচিতি নবজাগরণ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের শতক হিসাবে। সেইরকম বিংশ শতাব্দী ‘সবুজ বিপ্লব (Green Revolution)’-এর শতক; একবিংশ শতাব্দী (বা একুশ শতক) পরিচিত হচ্ছে ‘Knowledge Revolution’-এর শতক হিসাবে। একুশ শতক নিয়ে এসেছে চন্দ্রযানের চন্দ্রে অবতরণ থেকে করোনা ভাইরাস পর্যন্ত।


স্বামীজী বলেছিলেন : “Western science coupled with Vedanta.” বেদান্ত বিজ্ঞানের ভাষায় কথা বলুক, আর বিজ্ঞান মানবকল্যাণের ভাষায়। কিন্তু আমরা স্বামীজীর কথা কি শুনেছি? শোনার চেষ্টা করিনি। স্বামীজীর কথা শুনলে আজ বিজ্ঞানের কোনো অমানবিক মুখ দেখতে হতো না। “বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ।” একুশ শতকটির বাইরে হাসির ফোয়ারা থাকলেও ভিতরে চাপা আর্তনাদ। স্বামীজী পাশ্চাত্যবাসীকে সতর্ক করে বলেছেন : “The whole of the Western world is on a volcano….” তিনি আরো বলেছিলেন যে, পাশ্চাত্যকে বাঁচতে হলে তাদের প্রয়োজন ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিকতা। আর সেখানেই প্রাসঙ্গিকতা রামকৃষ্ণ সংঘের।


স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৩-এর ৯.১১-এর বক্তৃতায় যা বলেছিলেন, তার সারবস্তু ছিল—হিংসা নয়, মৈত্রী; শুধু সহিষ্ণুতা নয়, গ্রহিষ্ণুতা; দ্বেষ নয়, প্রেম; সংকীর্ণতা নয়, ঔদার্য; পরশ্রীকাতরতা নয়, সহানুভূতি। কিন্তু একুশ শতকের দোরগোড়ায় আমরা কী দেখলাম—আরো একটি ৯.১১—আমেরিকার টুইন টাওয়ারকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হলো—হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবী। কিন্তু কেন? কারণ, ১৮৯৩-এর ৯.১১-র কথা আমরা শুনিনি। শোনার জন্য কোনো আগ্রহও ছিল না।


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ‘League of Nations’ হলো। উড্রো উইলসনের চৌদ্দ দফা শর্ত অনুসারে যুদ্ধ বন্ধের কথা শুনে আমাদের মা—শ্রীমা সারদাদেবী বললেন : “ওরা যা বলে ওসব মুখস্থ। যদি অন্তঃস্থ হতো তাহলে কথা ছিল না।” League of Nations ভেঙে গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হলো United Nations (UN)। আশ্চর্য! UN Charter-এর সাথে রামকৃষ্ণ সংঘের ‘Memorandum of Association’-এর অদ্ভুত মিল! U. Thant—যিনি রাষ্ট্রপুঞ্জের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন, তিনি একথা বলেছেন। তাঁর কথারই প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই UNESCO-র ডিরেক্টর জেনারেল (1987—1999) Federico Mayor Zaragoza-র কণ্ঠে। ১৯৯৩ সালে তিনি একটি symposium-এ বলেছিলেন : UNESCO-র যে-সনদ, তার দুটি প্রধান স্তম্ভ এবং স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশনের যে ‘Memorandum of Association’—তার দুটি প্রধান স্তম্ভ একই, সমার্থক। হুবহু মিল রয়েছে এই দুয়ের মধ্যে। সে-দুটি কী? তিনি বলছেন—(১) ধর্ম সার্বজনীন (universal) এবং (২) গরিবদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ, সহযোগিতা, ভালবাসা এবং সর্বোপরি তাদের স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান, তাদের উন্নতির কথা ভাবা, তাদের অনটন যথাসাধ্য দূরীকরণের প্রচেষ্টা (Concern for the poor)। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন—১৮৯৭ সালে স্বামীজীর ধ্যানে ও প্রজ্ঞায় আগামী পৃথিবীর চালচিত্রটা ধরা পড়েছিল। মননশীল বিবেকানন্দ এত প্রগতিশীল ছিলেন! এত দূরদর্শিতা তাঁর ছিল! তিনি সপ্তর্ষির অন্যতম ঋষি। তিনি নররূপী নারায়ণ, জগৎকল্যাণের জন্য ধরাধামে অবতীর্ণ। তিনি শিবাবতার। তিনি এক সভায় বলছেন : “You may curse me today, but tomorrow you will bless me.” বেলুড় মঠে দাঁড়িয়ে তিনি বলছেন : “Do not think I imagine it, I see it.”—আমি প্রত্যক্ষ দেখছি, আমি কল্পনা করছি না। আমেরিকায় এক বক্তৃতায় অনুভূতির চরম তত্ত্ব বোঝাতে স্বামীজী নিজের বুকে হাত দিয়ে বলেছিলেন  : “I am God.”—আমিই ঈশ্বর। অপর একটি প্রেক্ষিতে তিনি বলেছেন, তাঁর মহাসমাধির দশ বছর পর তাঁকে লোকে ভগবান বলে পুজো করবে। (“Within ten years of my death, I will be worshiped as a god.”)

তিনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সম্পর্কে যা ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, তা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল। তিনি রাশিয়া ও চীনের উত্থানের কথা বললেন। ভারতবর্ষ সম্পর্কে বললেন : “India can only rise by sitting at the feet of Sri Ramakrishna.”

Toynbee বলছেন—পাশ্চাত্যের ভাই ও বোনেরা আগামী বিপর্যয়ের হাত থেকে যদি সভ্যতাকে বাঁচাতে চাও, তাহলে প্রাচ্যের এই মানুষটির কথা শুনতে হবে।১০ সেই মানুষটি কে? অবশ্যই শ্রীরামকৃষ্ণ। Toynbee যখন ‘Creative Minority’র কথা বললেন, অনেকে মনে করেছেন, তিনি এই কথার মাধ্যমে রামকৃষ্ণ সংঘের সদস্যদের প্রতি ইঙ্গিত‌ করেছেন। স্বামীজীর উদ্দেশ্য ছিল জনতা-জনার্দনের মন্দিরে সেই গণপতিকে প্রতিষ্ঠা করা, যারা ‘সবার পিছে, সবার নীচে, সবহারাদের মাঝে।’১১ আজ শ্রীরামকৃষ্ণ সবার অলক্ষ্যে বিশ্ববাসীর হৃদয়ে স্থান করে নিচ্ছেন। দ‌ক্ষিণেশ্বরে একবার কেশবচন্দ্র সেন ঠাকুরকে বললেন : “যদি আদেশ দেন তাহা হইলে আপনার কথা সাধারণের নিকট প্রকাশ করিয়া দিই। তাহাতে বহুলোকের উপকার হইবে। আপনার কথা যত প্রচার হয় ততই জগতের মঙ্গল।” সেকথা শুনে ঠাকুর অর্ধবাহ্য অবস্থায় ডানহাত তুলে দৃঢ়স্বরে বললেন : “এর মধ্যে যে ভাব আছে, যে শক্তি আছে তাহা এখন প্রচার করিবার প্রয়োজন নাই—একে বক্তৃতা বা খবরের কাগজের দ্বারা প্রকাশ করিতে হইবে না। এর মধ্যে যে শক্তি আছে, যে ভাব আছে, তাহা যখন বাহির হইবার সময় হইবে, তখন আপনা আপনি তাহা চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িবে। শত শত হিমালয় পাহাড়ের দ্বারা চাপা দিলেও এর শক্তি, এর ভাব শত শত হিমালয় পাহাড়ের চাপ ভেদ করিয়া বাহির হইবে—চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িবে, কেহ ইহার প্রতিরোধ করিতে পারিবে না।”


একটি ঘটনার কথা বলি। ক্যালিফোর্নিয়ার জনবহুল রাস্তার ধারে দ্বিপ্রহরে পেট্রল পাম্পের সম্মুখে নিজদেহ জ্বালিয়ে দিল এক ধনী কন্যা—ন্যান্সি লুই ম্যুর। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার হাতে ধরা ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের সমাধিচিত্র। ভোগসর্বস্ব সমাজের প্রাত্যহিক জীবনের বিষ হজম করতে পারেনি বেচারা ন্যান্সি। তবুও সে অনুভব করেছিল, শ্রীরামকৃষ্ণই নারীজাতির পরিত্রাতা, উচ্চ-নীচ জনগণের পরিত্রাতা। তার পরদিন অলৌকিকভাবে ন্যান্সির সূত্র ধরে আমেরিকার সমস্ত সংবাদপত্রে ছেপে ওঠে শ্রীরামকৃষ্ণের ছবি। শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং প্রকাশ—স্বয়ম্ভু।


বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে Betty Friedan লিখিত বই The Feminine Mystique পাশ্চাত্য দেশগুলিতে নারীমুক্তি আন্দোলনে জোয়ার এনেছিল। আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক বন্ধন থেকে মুক্তির আন্দোলন। ২০ বছর পর এই লেখিকাই লিখলেন—The Second Stage। সব মুক্তি পেয়েও পূর্ণতার সন্ধান পাচ্ছেন না তাঁরা। তাই লেখিকা আশা করেছেন, জগতের প্রতি মাতৃত্ববোধ—বিশ্বজননীরূপেই হয়তো নারীজীবনে আসবে যথার্থ মুক্তির অনুভূতি। ঠাকুর-স্বামীজী এসেছিলেন এই নারীজাতির উত্থান সংগঠিত করতে। মা-ঠাকরুনের জীবন ছিল তার একটি উজ্জ্বল নমুনা (model)।


একুশ শতকের ‘প্রজ্ঞা-বিপ্লব’ যদি সফল করতে হয় তাহলে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ প্রভায় আলোকিত হতেই হবে। শ্রীমা বললেন, পৃথিবী ছাড়া আর কোথাও প্রাণীর অস্তিত্ব নেই। আজ পর্যন্ত কেউ তাঁর এই মহাবাক্যটিকে খণ্ডন করতে পারেনি।


স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন : “This Sangha is His (Sri Ramakrishna’s) very body.”১২ তিনি এসেছিলেন মানুষকে আশীর্বাদ করতে—“তোমাদের চৈতন্য হউক।” রামকৃষ্ণ সংঘ একুশ শতকের আলোর দিশারি। শ্রীরামকৃষ্ণ-বিষয়ক অন্যতম বিশিষ্ট পাশ্চাত্য গ্রন্থকার Cristophar Isherwood তাই তাঁকে ‘phenomenon’ বলে ঘোষণা করলেন।


এপ্রসঙ্গে অনেকে প্রশ্ন করেন—রামকৃষ্ণ সংঘের কি কিছু শেখার আছে একুশ শতকের পৃথিবী থেকে? আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় নেই। কারণ, রামকৃষ্ণ সংঘ মানুষের ঊর্ধ্বচেতনার উন্মেষের জন্য প্রত্যেক নরনারীকে অনুপ্রাণিত করে। রামকৃষ্ণ সংঘের সাধক, সাধন ও সাধ্য—তিনই আধ্যাত্মিক। আর পার্থিব জগৎ প্রয়াস করে অভ্যুদয়ের জন্য, নিঃশ্রেয়সের জন্য নয়। তবে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভাবান্দোলন তো ‘sacred & secular’, মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যে সেতুবন্ধন করেছে। নিবেদিতা বলছেন : “আমাদের গুরুদেবের জীবনের চরম তাৎপর্য, এইখানেই তিনি যে শুধু প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলনকেন্দ্র হইয়াছেন তাহা নয়, অতীত এবং ভবিষ্যতেরও। বহু এবং এক—যদি যথার্থই এক সত্তা হয়, তাহা হইলে শুধু সকল উপাসনাপদ্ধতিই নয়, সমভাবে সকল কর্মপদ্ধতি—সকল প্রকার প্রচেষ্টা, সকল প্রকার সৃষ্টিকর্মই সত্যোপলব্ধির পন্থা। তাহা হইলে আধ্যাত্মিক ও লৌকিক—এই ভেদ আর থাকিতে পারে না। কায়িক পরিশ্রম করাই প্রার্থনা; জয় করাই ত্যাগ করা, সমগ্র জীবনই ধর্মকার্য হইয়া যায়। যোগ ও ক্ষেম—ত্যাগ ও বর্জনের মতোই দায়স্বরূপ।”১৩ স্বাভাবিকভাবেই অভ্যুদয়-নিঃশ্রেয়স যখন মিলে-মিশে একাকার হয়ে গেছে, তখন একুশ শতকের পৃথিবী থেকে রামকৃষ্ণ সংঘের শেখার কিছু কিছু উপাদান নিশ্চয়ই আছে।

একুশ শতকের মানবসমাজের আর্থ-সামাজিক (socio-economic) চালচিত্রটি কেমন? সামাজিক ও রাজনৈতিক বেশ কিছু বদল আমরা দেখতে পাচ্ছি। তার একটা হলো—মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের পরিসর ক্রমেই কমে আসা। কেউ কেউ একে ‘Age of Surveillance Capitalism’ আখ্যা দিয়েছেন। অফিস, দোকান, ব্যাঙ্ক, স্কুল-কলেজে সিসিটিভির ব্যবহার থেকে শুরু করে মোবাইলের বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য এখন নজরদারির আওতায়। প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির সুযোগে এই তথ্য কাজে লাগিয়ে মানুষের আচরণ নির্ধারণ করতে সক্রিয় অনেকেই। বিজ্ঞাপনদাতা চাইছে—মানুষ তার পছন্দমতো বিজ্ঞাপন বেছে নিক। রাষ্ট্র চাইছে আরো আরো মানুষের কাছে নিজের কাজগুলি গ্রহণযোগ্য করে তুলতে। ‘Big Data Analysis’ ও ‘Artificial Intelligence’ এই সুযোগ এনে দিয়েছে।


এপ্রসঙ্গে ইজরায়েলের বিখ্যাত ঐতিহাসিক Noah Harari-র মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলছেন : “সব ক্ষেত্রেই যন্ত্র তথা অটোমেশনের প্রয়োগ বাড়ছে। অনেক কোম্পানি মানুষ কর্মীর নিয়োগ কমিয়ে রোবট কাজে লাগাচ্ছে। আগামী দিনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও রোবটের ব্যাপক প্রচলন হওয়ার সম্ভাবনা। মানুষের মস্তিষ্ক ও কম্পিউটারের যোগসাধনের চেষ্টাও চলছে। ভবিষ্যতে এমন হওয়াও বিচিত্র নয় যে, রোবটের মস্তিষ্ক কলকাতায়, কিন্তু সিঙ্গাপুরে একজোড়া কৃত্রিম হাতকে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে সে কোনো রোগীর অস্ত্রোপচার সেরে ফেলল! এমনকী রক্তস্রোতে মিশিয়ে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পাঠানো যায় এমন ন্যানো-রোবট তৈরিরও প্রয়াস চলছে।


“কিন্তু মানুষের স্বভাবের মূলে এক অতৃপ্তি যা পাওয়া গেছে তাতে তার সন্তোষ নেই। সে ক্রমশই সীমানা বাড়িয়ে যেতে চায়। মন্বন্তর, মহামারী ও যুদ্ধকে কবজায় আনার পর মানুষের সম্ভাব্য লক্ষ্য জরা ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা। ২০১৩-তে শুরু হয়েছে গুগলের ‘Calico’ প্রোজেক্ট—যার লক্ষ্য জরা ও মৃত্যুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সমাধানের চেষ্টা।”


এত উন্নতি সত্ত্বেও মানুষ কি ‘মানুষ’ (অর্থাৎ ‘মান’ আর ‘হুঁশ’) হতে পেরেছে? ২০২০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত কোভিড-১৯ অতিমারীর কথা ভাবুন। আর পাশাপাশি ভেবে দেখুন বহির্ভারতের কিছু দেশের যুদ্ধ-পরিস্থিতির কথা; যতদিন পর্যন্ত মানুষের মধ্যে পাশবিক বৃত্তি থাকবে, ততদিন যুদ্ধ-নিনাদ শোনা যাবে।


এই পরিপ্রে‌ক্ষিতে রামকৃষ্ণ সংঘ ‘Social Media’ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিতে পারে পৃথিবীর সর্বত্র রামকৃষ্ণ সংঘের ভাব ও আদর্শকে ছড়িয়ে দিতে। বাহ্য ও আন্তর্জীবনের মধ্যে সমন্বয়বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের জনৈক প্রাক্তন রাজ্যপাল রামকৃষ্ণ মিশন সেবাপ্রতিষ্ঠানের একটি অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেছিলেন : “Swamis of Ramakrishna Order are as comfortable with the computer as with the rosary.” আজকের ‘global village’-এর ‘concept’ যখন প্রত্যেকের মনে দানা বেঁধেছে, তখন রামকৃষ্ণ সংঘ তার শিবজ্ঞানে জীবসেবা ও বেদান্তের বাণী বিশ্বময় ছড়িয়ে দিেত পারে। একুশ শতক রামকৃষ্ণ সংঘকে হাতছানি দিচ্ছে সমগ্র পৃথিবীতে এক মশালের মতো ছড়িয়ে পড়তে।


রামকৃষ্ণ সংঘ ‘Practical Vedanta’-এর কথা বলবে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলবে। শান্তির কথা বলবে, আধ্যাত্মিক বিকাশের কথা বলবে। একুশ শতকের দিকে এক পলক দৃকপাত করলে সহজেই বোঝা যায়, রামকৃষ্ণ সংঘের মাধ্যমে স্বামীজীর স্বপ্ন সাকার হতে চলেছে—“ভারত আবার জগতসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে।”১৪ স্বামীজী তাঁর দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছিলেন—নিদ্রিত ভারত জাগছে।


জগন্নাথের রথ চলছে। আমরা যদি তার রজ্জু আকর্ষণ করি তাহলে ধন্য হব। কিন্তু এই রথের গতিরোধের প্রয়াস করলে তা ব্যর্থ হবে। শ্রীরামকৃষ্ণের আঙিনায় সবার আমন্ত্রণ। শ্রীমা বলছেন : “আমার শরৎ যেমন ছেলে, এই আমজদও তেমন ছেলে।”১৫ ধনী-নির্ধন, অজ্ঞ-ব্রহ্মজ্ঞ, শিখ-জৈন, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, হিন্দু-মুসলমান, উন্মাদ-স্থিতধী, আস্তিক-নাস্তিক—সবাইকে রামকৃষ্ণ সংঘ স্বাগত জানায়। এজন্যই রামকৃষ্ণ সংঘ ‘inclusive’ (সর্বগ্রাহী) এবং ‘universal’ (সার্বজনীন)।

স্বামীজী বলেছেন : “…what will save Europe is the religion of the Upanishads.”১৬ আর সে-কথারই অনুরণন আমরা লক্ষ্য করি রোমাঁ রোলাঁর লেখনীতে। তিনি লিখছেন : “I am bringing to Europe, as yet unaware of it, the fruit of a new autumn, a new message of the Soul, the symphony of India, bearing the name of Ramakrishna…. It is my desire to bring the sound of the beating of that artery to the ears of fever-stricken Europe, which has murdered sleep. I wish to wet its lips with the blood of Immortality.”১৭ আধুনিককালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈজ্ঞানিক Eleanor Stark তাঁর The Gift Unopened গ্রন্থে লিখছেন : “Columbus… discovered the soil of America. Vivekananda discovered its soul.”১৮ বিবেকানন্দ শুধু আমেরিকার আত্মারই উদ্বোধক ছিলেন না, তিনি ভারতের আত্মারও পুনরাবিষ্কার করেছিলেন। তিনি ভগিনী নিবেদিতাকে তাঁর আদর্শের, জীবনব্রতের কথা বলেছিলেন : “My ideal indeed can be put into a few words and that is: to preach unto mankind their divinity, and how to make it manifest in every movement of life.”১৯ ঊনবিংশ শতাব্দীর এক জার্মান দার্শনিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন : “In the whole world there is no study so beneficial and so elevating as that of the Upanishads…. The world is about to see a revolution in thought more extensive and more powerful than that which was witnessed by the Renaissance of Greek Literature.”২০ আজ একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে আমরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি, প্রতিনিয়ত এই নিঃশব্দ ও নীরব বিপ্লব সংঘটিত হচ্ছে বিবেকানন্দের আত্মপ্রকাশ ও আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে। আর সেই ভাবটিকে সহস্রধারায় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই রামকৃষ্ণ–বিবেকানন্দের ‘ভিসন’ (vision) রামকৃষ্ণ মিশন-এর প্রতিষ্ঠা। একবিংশ শতকের প্রথম দুই দশকেই সভ্যতা উৎকৃষ্ট-মানব (man of excellence)-এর সন্ধান পেয়েছে। সেই উৎকর্ষের সবটাই হচ্ছে বাহ্যজগতে সৌকর্য। আজ মানুষ চাঁদে অবতরণ করেছে, মঙ্গলগ্রহে ‘remote-controlled space ships’ পাঠাতে পেরেছে; কিন্তু ‘thermonuclear’ যুদ্ধের ভয়াবহ সম্ভাবনা দূরীভূত হয়নি, বরং এই ভয় মানুষকে গ্রাস করে ফেলছে। ১৮৯৩-এর ৯.১১-এর ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে সংঘটিত হলো আমেরিকার ‘twin-towers’-এর ধ্বংসলীলা। ‘Artificial Intelligence’, ‘Skill Development’—এই গালভরা কথাগুলো দিন দিন মানুষের জীবনে অভাবনীয় ‘গতি’ এনে দিয়েছে, কিন্তু আবেগকে কেড়ে নিয়েছে। এই সংকটময় মুহূর্তে পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবীরা এক নতুন আলোর সন্ধান পাচ্ছেন বিবেকানন্দের মধ্যে। সেই ‘আলো’ আশার আলো, ভরসার আলো। এই আলোকবর্তিকাটি হচ্ছে—উপনিষদ, ফলিত বেদান্ত ও রামকৃষ্ণ মিশন।


স্বামীজী বিলক্ষণ জানতেন যে, রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠা এবং শিবজ্ঞানে জীবসেবার আদর্শকে অনেকে অনায়াসে গ্রহণ করতে পারবে না। স্বামীজী তাই স্পষ্টতই বললেন : “You may not like what I am saying. You may curse me today, but tomorrow you will bless me.”২১ তাই তো সিস্টার ক্রিস্টিন স্বামীজী সম্পর্কে লিখছেন : “He was in a class by himself. He belonged to another order. He was not of this world. He was a radiant being who had descended from another, a higher sphere for a definite purpose. One might have known that he would not stay long.”২২ সমাধিস্থ শ্রীশ্রীঠাকুর জ্যোতির্ময় বর্ত্মে উচ্চে আরোহণ করতে করতে অখণ্ডের ঘরে প্রবেশ করলেন। দেখলেন সাতজন ঋষি—যাঁরা জ্ঞানে ও প্রজ্ঞায় দেবতাদেরও ছাড়িয়ে গিয়েছেন। একটি ছোট্ট শিশুর রূপে ঠাকুর সেই ঋষিদের অন্যতমের নিকট অভিগমন করলেন। সস্নেহে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরলেন। ঋষিকে ঠাকুর বললেন—আমি যাচ্ছি, তোমাকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে। ঋষি নির্নিমেষ নেত্রে তাকিয়ে দেখলেন, এই শিশুই তাঁর হৃদয়ের ধন। তিনি মৌন সম্মতি জানালেন। স্বামী সারদানন্দজী তাঁর অনবদ্য লেখনীতে অনুপমভাবে পরিবেশন করেছেন ঠাকুরের উচ্চারিত কথাগুলো—“বিস্মিত হইয়া দেখি, তাঁহারই শরীর মনের একাংশ উজ্জ্বল জ্যোতির আকারে পরিণত হইয়া বিলোমমার্গে ধরাধামে অবতরণ করিতেছে! নরেন্দ্রকে দেখিবামাত্র বুঝিয়াছিলাম, এ সেই ব্যক্তি!”২৩ নরেন্দ্রনাথ সম্পর্কে ঠাকুর অন্য একদিন আরেকটি দিব্যদর্শনের কথা বলেন। ঐ দর্শনে তিনি দেখতে পান, একটি অত্যুজ্জ্বল আলোকরেখা কাশীধাম থেকে কলকাতার দিকে ছুটে আসছে। তখন তিনি আনন্দে বলেন : “আমার প্রার্থনা পূর্ণ হয়েছে, আমি যাকে চাই সে একদিন না একদিন আমার কাছে আসবেই।”২৪ আজ কারো অজানা নয়, শ্রীরামকৃষ্ণের প্রার্থিত সেই দিব্যপুরুষ ভাবিকালের স্বামী বিবেকানন্দ। শুরু হলো শ্রীরামকৃষ্ণের নরেন্দ্র-সাধনা। হবেই তো! গরজ বড় বালাই! জগন্মাতার নির্দেশ একটি নবধর্মচক্র স্থাপন করতে। অনাদিকালের মহাযজ্ঞাগারে পুরোহিত নরেন্দ্রনাথ তথা স্বামী বিবেকানন্দ আর তন্ত্রধারক অবশ্যই সেই বেদপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ। ঠাকুর বলছেন : “নরেন শি‌ক্ষে দিবে, যখন ঘরে-বাইরে হাঁক দিবে।”২৫ অনাদিকালের এই যজ্ঞাগারটিই হলো ভাবিকালের রামকৃষ্ণ মিশনের সূতিকাগৃহ। রামকৃষ্ণ মিশনের জন্মলগ্নে কয়েকজনের মনে সংশয় ছিল, মতান্তর ছিল—যদিও মনান্তর নয়। মা-ঠাকরুনের অসীম কৃপায় সংশয়ের মেঘ কেটে গেল। তিনি সবার অল‌ক্ষ্যে মঠ এবং মিশনের ‘guide, guardian and angel’-এ পরিণত হলেন। তিনি সংঘজননী। বললেন : “নরেন ঠাকুরের হাতের যন্ত্র।” ঠাকুরের মহাসমাধির কয়েকদিন আগে নরেন্দ্রনাথ অনুভব করলেন যে, ঠাকুরের দেহ থেকে সূ‌ক্ষ্ম তেজোরাশি তড়িৎকম্পনের মতো তাঁর শরীরে প্রবেশ করছে। সাশ্রু নয়নে শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্রনাথকে বললেন : “আজ যথাসর্বস্ব তোকে দিয়ে ফকির হলুম। তুই এই শক্তিতে জগতের কাজ করবি।” নরেনের ভিতরে প্রতিষ্ঠিতা সেই শক্তিই রামকৃষ্ণ মিশন সৃষ্টি করেছেন। আজ তারই ১২৫ বর্ষ উদ্‌যাপন। উদ্‌যাপন চলছে ভারতে ও বহির্ভারতে। স্বামীজী বলেছেন : “এই বেলুড়ে যে আধ্যাত্মিক শক্তির ক্রিয়া শুরু হয়েছে তা দেড় হাজার বছর ধরে চলবে…।”২৬ সবে সূর্যোদয় হয়েছে। আরো বহুকাল এই সংঘ পৃথিবীর মানুষকে পথ দেখাবে। স্বামীজীর ভবিষ্যদ্বাণী অভ্রান্ত। তিনি দিব্যদৃষ্টিতে এই সত্যটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন।


মনে পড়ে স্বামীজীর কথা—“…I fervently hope that the bell that tolled this morning in honour of this convention may be the death-knell of all fanaticism….”২৭ স্বামীজী বললেন : “সাধন-ভজন ও জ্ঞানচর্চায় এই মঠ প্রধান কেন্দ্রস্থান হবে—এই আমার অভিপ্রায়। এখান থেকে যে শক্তির অভ্যুদয় হবে, তা জগৎ ছেয়ে ফেলবে; মানুষের জীবনগতি ফিরিয়ে দেবে; জ্ঞান ভক্তি যোগ ও কর্মের একত্র সমন্বয়ে এখান থেকে ideals (উচ্চাদর্শসকল) বেরোবে…।”২৮ কালে সারা পৃথিবী এক আধ্যাত্মিক প্লাবনে পরিপ্লাবিত হবে। বেলুড় মঠ হবে স্নায়ুকেন্দ্র। সবেমাত্র ১২৫ বছর আমরা পেরিয়েছি। এর মধ্যেই উথাল-পাতাল! তাহলে একবার ভেবে দেখুন ব্যাপারটা কী হতে চলেছে!


নীলাম্বরবাবুর উদ্যানবাটীতে যখন মঠ, তখন মাতাঠাকুরানির এক অসাধারণ দর্শন হয়েছিল। দর্শনটি এরূপ—শ্রীরামকৃষ্ণ গঙ্গাবক্ষে নেমে গেলেন, সাথে সাথেই তাঁর ভাগবতী তনু গঙ্গায় মিশে গেল, মিলিয়ে গেল। আবির্ভূত হলেন স্বামীজী। তিনি ‘জয় রামকৃষ্ণ’, ‘জয় রামকৃষ্ণ’ উচ্চারণের সাথে ব্রহ্মবারি গঙ্গাবারিতে সিঞ্চিত করছেন—তৃষিত সমস্ত মানবজাতিকে। আর সবাইকে মুক্ত করে দিচ্ছেন।


Arnold Toynbee-র একটি মন্তব্য এপ্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলছেন : “In history books written fifty years or hundred years from now, I do not think Sri Ramakrishna’s name will be missing…. I am thinking particularly of the community development work. This is helping the peasants, in the hundreds of thousands of Indian villages, to realize that they can do something, by their own efforts, to make their lives better. Making them better means making them better materially as a means to making them better spiritually—and this brings us back to religion and to Sri Ramakrishna.”২৯


তাই তো স্বামীজী বললেন : “দরিদ্রদেবো ভব, মূর্খদেবো ভব।”৩০ তিনি আরো বললেন : “নূতন ভারত বেরুক। বেরুক লাঙল ধরে, চাষার কুটির ভেদ করে, জেলে মালা মুচি মেথরের ঝুপড়ির মধ্য হতে। বেরুক মুদির দোকান থেকে, ভুনাওয়ালার উনুনের পাশ থেকে।”৩১


বর্তমান সমাজের বিদ্বৎ ব্যক্তিগণ রামকৃষ্ণ মিশন সম্পর্কে কী ভাবছেন সেগুলির কয়েকটি নিদর্শন দিলে একুশ শতকে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাসঙ্গিকতা আরো স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে।


বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পূর্বতন উপদেষ্টা এবং বর্তমানে আমেরিকার কর্নেল ইউনিভার্সিটির ‘C. Marks প্রফেসর’ ডঃ কৌশিক বসু মন্তব্য করেছেন : “বিবেকানন্দ এখানে [বেলুড় মঠ] মিশন স্থাপন করার একটি কারণ ছিল যে, এটি দক্ষিণেশ্বরের কাছাকাছি। দক্ষিণেশ্বর হলো রানি রাসমণি দ্বারা নির্মিত একটি মন্দির। রানি নিম্নবর্ণের হওয়ায় একজন ব্রাহ্মণ পুরোহিত খুঁজে পেতে তাঁর খুব অসুবিধা হয়েছিল। অবশেষে তিনি দুই বিদ্রোহী ভাইকে খুঁজে পেলেন। ছোট ভাই রামকৃষ্ণ বিশেষ তীক্ষ্ণতার সাথে ধর্মের সমস্ত নিয়ম ও আচার-অনুষ্ঠান ভেঙে দিয়েছিলেন এবং সার্বজনীন প্রেমের একটি সহজ বার্তা প্রচার করেছিলেন—যা তাঁর শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ ১১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৩ তাঁর বিখ্যাত শিকাগো-ভাষণে প্রতিধ্বনিত করেছিলেন—‘আমি সর্বতোভাবে আশা করি, এই ধর্ম-মহাসমিতির সম্মানার্থ আজ যে-ঘণ্টাধ্বনি নিনাদিত হইয়াছে, তাহাই সর্ববিধ ধর্মোন্মত্ততা, তরবারি অথবা লেখনীমুখে অনুষ্ঠিত সর্বপ্রকার নির্যাতন এবং একই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর ব্যক্তিগণের মধ্যে সর্ববিধ অসদ্ভাবের সম্পূর্ণ অবসানের বার্তা ঘোষণা করুক।’ এবং আমাদের ভাল করে মনে রাখা দরকার, বিবেকানন্দের বক্তৃতার উদ্ধৃতি দিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের বর্তমান সংঘাধ্যক্ষ লিখেছেন—‘এই শব্দগুলি উচ্চারণের পর থেকে এক শতাব্দী পার হয়ে গেছে। এই বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে কেউ অনুভব করে যে, আমাদের যথেষ্ট সামর্থ্য এবং গোষ্ঠীর আনুগত্য থাকা সত্ত্বেও আমরা যেন পিছিয়ে যাচ্ছি বর্বরতার যুগের দিকে।’”৩২


অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত গবেষক-অধ্যাপক হিন্দোল সেনগুপ্ত লিখেছেন : “শুরুতেই বলি, এই সংঘ সার্বজনীন আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর পথিকৃৎ সাধক হলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস, উনিশ শতকের একজন বাঙালি অতীন্দ্রিয়বাদী—যিনি হিন্দুধর্মের গুহ্য তন্ত্রবাদ ও মহিমান্বিত বেদান্তদর্শন থেকে শুরু করে খ্রিস্টানধর্ম পর্যন্ত প্রতিটি পথের মাধ্যমে ধর্মীয় সত্য বা ঈশ্বরকে সন্ধান করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। তিনি যে-উত্তরটি দিয়েছিলেন তা হলো—‘যত মত তত পথ’ (যতগুলি ধর্ম আছে, ঈশ্বরকে পাওয়ার ততগুলিই পথ আছে)। পরমহংসের উদার মতবাদের ফলস্বরূপ তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ শিষ্য নরেন্দ্রনাথ দত্ত (যিনি পরে স্বামী বিবেকানন্দ হয়েছিলেন), এক অর্থে, প্রারম্ভেই তাঁর ‘প্রতিদ্বন্দ্বীদের’ তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করার স্বাধীনতা পেয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক মতবাদের প্রতি পরমহংসের অনাসক্তির ফলে বিবেকানন্দ শুধুমাত্র হিন্দুধর্মের দার্শনিক ঐতিহ্যকেই অনুসরণ করে ক্ষান্ত হননি, উপরন্তু তিনি তাঁর অনুসন্ধানকে অন্যান্য উপযুক্ত কিছুতেও প্রসারিত করতে পেরেছিলেন। বিবেকানন্দের মধ্যে পরমহংসের শিক্ষার গভীর ও চিরস্থায়ী স্বত্বাধিকার ছিল, প্রকৃতপক্ষে তিনি সারাজীবন এঁর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন; কারণ এটি অনাসক্ত স্বাধীনতা প্রদান করে এবং তাঁর কল্পনাকে উন্মুক্ত রাখে।”


কলকাতার চীনা দূতাবাসের কনসাল জেনারেল ঝা ল্যিয়ু আমাকে একটি চিঠিতে ২০২০ সালে মন্তব্য করেছিলেন : “আমি রামকৃষ্ণ এবং স্বামী বিবেকানন্দের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুরু হওয়া আদর্শ ও কর্মকাণ্ডে গভীরভাবে মুগ্ধ। তাঁরা শুধুমাত্র ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত চিন্তাবিদ এবং আধ্যাত্মিক নেতাই নন, চীনের বহু অধিবাসীর কাছেও বিশেষ সমাদৃত।… চীন এবং ভারত দুই-ই মহাপ্রাচীন সভ্যতা হওয়ায় আমাদের সংযোগের জন্য, নতুন পথের সন্ধান দেওয়ার জন্য আরো মহান সমসাময়িক চিন্তাবিদদের প্রয়োজন, যাতে আমরা আরো দক্ষতার সাথে কদর করতে এবং একে অপরের কাছ থেকে শিখতে পারি।”


উপসংহারে স্মরণ করি Christopher Isherwood-এর মন্তব্য। তিনি বলেছেন : “The Ramakrishna Movement is unique because its Founder was unique. Even those who do not wish to believe that Sri Ramakrishna was a Son of God, like Jesus of Nazareth, must surely admit that he is incomparably the greatest spiritual leader produced by mankind in the past two centuries. (This claim is almost absurdly modest!) And who, in the world’s recent history, can stand beside Ramakrishna’s disciples, Vivekananda and Brahmananda?


“Spiritual truth is eternal, but it has to be restated and redemonstrated in a human life in order that it may solve the varying problems of each succeeding epoch. Ramakrishna’s teaching is our modern gospel. He lived and taught for us, not for the men of two thousand years ago; and the Ramakrishna movement is responsible for the spreading of his gospel among us, here and now. For this reason alone, the Movement must be regarded as the most important of all existing religious movements, no matter how large or influential or venerable the others may be. The statement may sound startling, as of today. It is always hard to recognize the power and magnitude of a new spiritual force; and the Ramakrishna Movement is very new, historically speaking. The growth of such a force can only be traced in retrospect, after centuries have passed. By the time the historians have become aware of a great spiritual revolution, the revolution has already completed itself and spent its energy, and a new revolution is about to take place!”৩৩

রামকৃষ্ণ সংঘের ভাবটি হচ্ছে বৈদিক আপ্তবাক্য—
“সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ।
সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু মা কশ্চিদ্ দুঃখভাগ্‌ ভবেৎ॥”


সবাই সুখী থাকুন, সবাই সুস্থ্য থাকুন, সবাই সত্য-শিব-সুন্দরের দর্শনে ধন্য হোন, কারো যেন কখনো কোনো দুঃখ না হয়। “Blessings for all and curse for none!” রামকৃষ্ণ সংঘের কলসখানি শুধুই আশীর্বাদ ও নিঃস্বার্থ প্রেমসুধায় ভর্তি। অভিশাপ কদাপি নয়!
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—

“বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা
ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা।
তোমার জীবনে অসীমের লীলাপথে
নূতন তীর্থ রূপ নিল এ জগতে।”৩৪


শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাবে জগতের সেই নতুন তীর্থটি হলো রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান কেন্দ্র বেলুড় মঠ—যে-পুণ্যস্থানটি কালাতীত, যে-ভাবের কোনো মৃত্যু নেই—‘undying spirit’। কবিকে অনুসরণ করে বলাই যেতে পারে—এই মঠ ‘কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল…’!৩৫

তথ্যসূত্র

১. Burke, Marie Louise, Swami Vivekananda in the West : New Discoveries, Advaita Ashrama, Calcutta, 1996, vol. 4, p. 421

২. Mrs. Sen, Gertude Emerson, ‘As I Know Her’, ‘Prabuddha Bharata’, March 1978, p. 125
৩. The Complete Works of Swami Vivekananda, Advaita Ashrama, Kolkata, 2021, vol. 5, p. 370
৪. C.W., 2020, vol. 3, p. 292
৫. স্বামী ঈশানানন্দ, মাতৃসান্নিধ্যে, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ২০১৪, পৃঃ ৬৫
৬. His Eastern and Western Admirers, Reminiscences of Swami Vivekananda, Advaita Ashrama, 2012, p. 243
৭. স্বামী চেতনানন্দ, বহুরূপে বিবেকানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১১, পৃঃ ৮
৮. Burke, Marie Louse, Swami Vivekananda in the West, New Discoveries, Advaita Ashrama, 1999, vol. 6, p. 51
৯. C.W., 2021, vol. 6, p. 291
১০. দ্রঃ Swami Ghanananda, Sri Ramakrishna and His Unique Message, Advaita Ashrama, 2016, Foreword by Arnold Toynbee
১১. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ, গীতবিতান, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, ১৪১২, পৃঃ ১৯৩
১২. Rules and Regulations of the Ramakrishna Math, Belur, Framed by Swamiji in 1897-98, p.8
১৩. C.W., 2021, vol. 1, p. xvii
১৪. সেন, অতুলপ্রসাদ, গীতিগুঞ্জ, পাতাবাহার, কলকাতা, ১৪২০, পৃঃ ৭২
১৫. শ্রীশ্রীমায়ের কথা, উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১৯, অখণ্ড, পৃঃ ১৬১
১৬. C.W., 2020, vol. 3, p. 174
১৭. Rolland, Romain, The Life of Ramakrishna, Advaita Ashrama, 2012, pp. xxi-xxii
১৮. Stark, Eleanor, The gift Unopened, Peter E. Randall (Publisher), U.S.A., 1988, p. 10
১৯. Letters of Swami Vivekananda, Advaita Ashrama, 2013, p. 294
২০. দ্রঃ C.W., 2020, vol. 3, p. 125
২১. C.W., 2021, vol. 8, p. 128
২২. Reminiscences of Swami Vivekenanda, pp. 146-47
২৩.স্বামী সারদানন্দ, ‘ঠাকুরের দিব্যভাব ও নরেন্দ্রনাথ’, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ, উদ্বোধন কার্যালয়, ২০০৬, ২য় ভাগ, পৃঃ ৫৪-৫৫
২৪. দাশগুপ্ত, মানদাশঙ্কর, স্বামী বিবেকানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, ২০০৩, পৃঃ ৪৫-৪৬
২৫. স্বামী প্রভানন্দ, শ্রীরামকৃষ্ণের অন্ত্যলীলা, উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১০, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৪৩
২৬. স্বামী গম্ভীরানন্দ, যুগনায়ক বিবেকানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, ১৩৭৩, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৪৪৭
২৭. C.W., vol. 1, p. 4
২৮. বাণী ও রচনা, ১৯৯৯, ৯ম খণ্ড, পৃঃ ৭৮
২৯. Toynbee, Arnold, ‘Sri Ramakrishna and the Indian Contribution to World Harmony’, ‘Vedanta and the West’, no. 141, Vedanta Society of Southern California, Hollywood, USA, January-February, 1960, p. 10
৩০. স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১৫, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ৪১
৩১. ঐ, ২০১৫, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৬৪
৩২. Basu, Kaushik, ‘Economic Graffiti : A Hinduism more Tolerant’, ‘The Indian Express’, New Delhi, Updated : June 22, 2018 (https://indianexpress.com)
Swami Gambhirananda, History of Ramakrishna Math and Ramakrishna Mission, Advaita Ashrama, Calcutta, 1983, Foreward, p. vi
৩৩. রবীন্দ্র রচনাবলী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৩৬৮, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৯৭১-৭২
৩৪. ঐ, ১৩৬৮, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪৭৭

‘স্বামী মাধবানন্দ স্মারক রচনা’রূপে এটি প্রকাশিত হলো।

সাধারণ সম্পাদক, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন